এফ-কমার্স থেকে ইকমার্সে ব্যবসা রূপান্তর করার সঠিক সময় কখন?

এফ-কমার্স থেকে ইকমার্সে ব্যবসা রূপান্তর করার সঠিক সময় কখন?

ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসা বা এফ-কমার্স বহুদিন ধরে চলে আসা একটি ট্রেন্ড ইকমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে। যদিও বা ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান হয়েছে মূলতঃ সামাজিক যোগাযোগের জন্যে, তবে বর্তমানে প্রায় সব সোশ্যাল মিডিয়াতেই কমার্স তথা বাণিজ্য একটি বিশেষ ফিচার হয়ে গিয়েছে। এই যেমন ফেসবুক পেইজ খুলে অনেকেই কত প্রোডাক্ট বিক্রি করছেন অনলাইনে।

কিন্তু শুধুমাত্র ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তোলা কতটা যৌক্তিক? বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়ে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে শুধু ফেসবুক ভিত্তিক হয়ে থাকাটা এক্সপার্টরা সাপোর্ট করেন না।

তাই আজ আমরা জানবো একটি ব্যবসা এফ-কমার্স থেকে ইকমার্সে রূপান্তর করার সঠিক সময় কখন?

সোজা উত্তর হচ্ছে, এখনই!

তবে এখানে কিছু বিষয় আছে, কেন এখনই এফ-কমার্স থেকে ইকমার্সে রূপান্তর করার সঠিক সময় তার কারণগুলো একনজরে জেনে নেয়া যাক,

১) ফেসবুক পেজের কার্যকারিতাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে

২) দৈনন্দিন অর্ডারের পরিমান যখন বাড়তে থাকবে তখন পেইজের ইনবক্সে এগুলো ম্যানেজ করাটা প্রচন্ড ঝামেলার হবে

৩) কাস্টমাররা আপনার প্রোডাক্টের পূর্ণাঙ্গ ক্যাটালগ দেখতে এবং আপনার অনলাইন স্টোর ‘এক্সপেরিয়েন্স’ করতে চাইবে

৪) কাস্টমাররা পেইজের ব্যবসার উপর শতভাগ আস্থা রাখবেনা

৫) ইকমার্স ব্যবসায় লং টার্ম সেলস মেশিন তৈরী করতে ডাটা প্রয়োজন

৬) ফেসবুকে অর্গানিক কাস্টমার-বেইজ তৈরী করা সম্ভব নয়

আসুন এবার বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।

১) ফেসবুক পেইজের কার্যকারিতাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে

ফেসবুক পেইজ সব দেখতে একই রকম লাগে, এটাকে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ আপনার নেই। তাছাড়া আপনার যত পণ্য আছে সব ক্যাটাগরি আকারে এবং গোছানোভাবে কাস্টমাররা দেখতে পায়না।

আপনি যখন নিজের ওয়েবসাইট তৈরী করেন তখন সেটি নিজের ব্র্যান্ডের সাথে মিলিয়ে এবং আপনার ইন্ডাস্ট্রির ট্রেন্ডের সাথে তাল রেখে সাজাতে পারেন। এতে করে কাস্টমাররা আপনার ব্র্যান্ডকে উপভোগ করতে পারে যেটি আপনার সেলস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

ফেসবুক পেইজের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, এটি যেকোন সময় ডিজেবল হয়ে যেতে পারে, রেস্ট্রিকটেড হয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে নিশ্চয়ই দেখেছেন যে অনেকেরই এড একাউন্ট থেকে শুরু করে পেইজ রেস্ট্রিকটেড হয়েছে ফেসবুকের কমিউনিটি গাইডলাইন ভঙ্গের কারণে। এরকম ঘটনায় আপনার অনেকদিনের তৈরী করা পেইজটি মুহূর্তেই হারিয়ে যেতে পারে, যেখানে রয়েছে লাইক, কমেন্ট সহ কাস্টমারদের সাথে আলাপের তথ্য। অথচ আপনি যদি ইকমার্স ওয়েবসাইট রাখেন, তাহলে এটি আপনার কন্ট্রোলে থাকবে, এবং ফেসবুকের উপর নির্ভর হয়ে থাকার জটিলতা কম থাকবে।

২) দৈনন্দিন অর্ডারের পরিমান যখন বাড়তে থাকবে তখন পেইজের ইনবক্সে এগুলো ম্যানেজ করাটা প্রচন্ড ঝামেলার হবে

ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে ইনবক্সে চ্যাট করে করে কাস্টমারদের সেল করছেন এবং অর্ডার নিচ্ছেন? একটি অর্ডার নিতে গেলে আধা ঘন্টা চলে যাচ্ছে শুধু অর্ডার নিয়ে কথা বলতে, প্রসেস করতে, পেমেন্ট নিতে এবং কনফার্মেশন জানাতে গিয়ে? কাস্টমার অর্ডার করেছে দুদিন আগে কিন্তু আপনি কাজের প্রেশারে সেটি ডেলিভারী দিতেই ভুলে গেলেন? এমন সব ঘটনা কিন্তু প্রায়ই ঘটে থাকে।

এভাবে শুরুতে ৫-১০ টি অর্ডার নিতে এমন হয়ত ঝামেলার মনে হবে না, কিন্তু যখন আপনি ব্যবসায় গ্রো করবেন, তখন শত শত অর্ডার আর চ্যাটের মাধ্যমে নেয়াটা সম্ভব হবেনা, কারণ তখন আপনার অনেক সময় এখানে ব্যয় হয়ে যাবে শুধু অর্ডার প্রসেস আর ম্যানেজ করতে। আপনি নোটখাতায় কিংবা এক্সেলের মত টুল ব্যবহার করে হয়ত অর্ডারগুলোর তথ্য রাখছেন, এবং সব তথ্য একটা একটা করে টুকে রাখছেন। কিন্তু এভাবে কি শত শত অর্ডার ম্যানুয়ালি টুকে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ?

তাছাড়া ফেসবুকে কোনো অর্ডার ম্যানেজমেন্ট এর সিস্টেমও নেই। একটা পণ্য কাস্টমারের কাছে অর্ডার নেয়ার জন্যে ডিজিটাল সিস্টেমের প্রয়োজন, যেটি ওয়েবসাইট এর সাথে সরাসরি কানেক্টেড থাকবে। কাস্টমার যখন অর্ডার দিবে এটি ঐ সিস্টেমে আসবে, আপনাকে এলার্ট দিবে এবং কাস্টমার কি অর্ডার করেছে, কয় টাকার পণ্য অর্ডার করেছে, পেমেন্ট মেথড কোনটি নির্বাচন করেছে যথা, ক্যাশ অন ডেলিভারী নাকি বিকাশের মত অনলাইন পেমেন্ট, এবং কাস্টমার কোন ঠিকানায় পণ্যটি ডেলিভারি চাচ্ছে এমন সবকিছু একটি জায়গায় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইকমার্স ব্যবসার জন্যে।

অর্ডার আসার পর তো সরাসরি পণ্য কাস্টমারের কাছে চলে যায়না, আপনাকে নিশ্চয় প্রসেস ফলো করতে হয়। শুরুতে অর্ডারটি কনফার্ম করতে হয় আপনার স্টকের উপর নির্ভর করে, অতঃপর সেটি ডেলিভারী কোম্পানীর নিকট দেয়া হয় এবং তারা কয়েকটি ধাপে পণ্যটি কাঙ্খিত কাস্টমারের নিকট পৌঁছে দেয়।

এইসব কিছুর তথ্য আপনার কাছে তাৎক্ষনিক থাকাটা জরুরি এবং এগুলোর কোনোটাই ফেসবুক পেইজের মাধ্যমে করা যায়না।

৩) কাস্টমাররা আপনার প্রোডাক্টের পূর্ণাঙ্গ কালেকশন দেখতে এবং আপনার অনলাইন স্টোর ‘এক্সপেরিয়েন্স’ করতে চাইবে

আপনি যখন কোনো দোকানে কিছু কিনতে যান আগে প্রোডাক্ট এর কালেকশন দেখতে চান। এরপর দেখেন সে পণ্যের দাম কত এবং অন্যান্য তথ্য, এরপর যেয়ে পণ্যটি কিনেন যদি বাজেট এবং পছন্দ মিলে যায়।

একইভাবে অনলাইনে যখন কেউ কিছু কিনতে আসবে তারাও আপনার পুরো দোকানে কি কি কালেকশন আছে তা দেখতে চাইবে, এরপর পছন্দ অনুযায়ী যেগুলো সিলেক্ট করবে এবং তা অর্ডার করবে। এর জন্যই ওয়েবসাইটটি কাজ করে আপনার ডিজিটাল দোকান হিসেবে, যেখানে কাস্টমার তার ইচ্ছেমত কালেকশন দেখতে পারে, এবং একটি সুন্দর শপিং এক্সপেরিয়েন্স নিতে পারে।

ফেসবুক পেইজে আপনি পোস্টের পর পোস্ট দিতেই আছেন, এবং অনেকেই হয়ত এসে কমেন্ট করছে কিংবা ইনবক্স করছে কোন প্রোডাক্টের দাম কেমন। আপনি সবার উত্তর একসাথে দিতে পারবেন না নিশ্চয়। কাস্টমার যখন এসেছে সে কিন্ত অল্প সময়ই অপেক্ষা করবে, সারাদিন বসে থাকবেনা রিপ্লাই এর জন্যে। একটি [রিসার্চ](https://www.wyzowl.com/human-attention-span/#:~:text=According to research%2C our attention,or object for 9 seconds.) বলছে, বর্তমান এই ইন্টারনেটের যুগে মানুষের কোনো বিষয়ে মনোযোগের মাত্রা ৮.২৫ সেকেন্ডে নেমে এসেছে, যেটি বুঝায় আপনি দ্রুত কথা না বললে তারা অন্যত্র চলে যাবে।

এক্ষেত্রে ওয়েবসাইট সেই সময়টুকু বাঁচিয়ে দেয় এবং কাস্টমারদের এক্সপেরিয়েন্স ও ভালো থাকে।

৪) কাস্টমাররা পেইজের ব্যবসার উপর শতভাগ আস্থা রাখবেনা

ফেসবুক পেইজ খুলে তো হাজারো বিজনেস আছে, কিন্তু সবাই কি আস্থা অর্জন করতে পারে? কাস্টমার যখন দেখে একটি ওয়েবসাইট আছে, যেখানে সবকিছু সাজানো গোছানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সমূহ আছে, তখন কাস্টমার এর আস্থা আসবে। তাছাড়া এখন বাংলাদেশ সরকার থেকেও ইকমার্স ব্যবসা নিয়ে বেশ কড়াকড়ি আইন নেয়া হচ্ছে, যেন ভোক্তারা সঠিক এবং কাঙ্খিত সার্ভিসটি পায়।

যদি ফেসবুক পেইজ খুলেই ব্যবসাকে বড় করা যেত তাহলে যারা ইকমার্স ওয়েবসাইট করে ব্র্যান্ড তৈরী করেছে, তারাও ফেসবুক দিয়েই চালিয়ে দিত। আদতে যেটি হয় না।

৫) ইকমার্স ব্যবসায় লং টার্ম সেলস মেশিন তৈরী করতে ডাটা প্রয়োজন

কখনো খেয়াল করেছেন কেন অনলাইনে ভালো ব্র্যান্ডগুলো তাদের ওয়েবসাইটে পণ্য বিক্রি করে থাকে এবং ফেসবুক কিংবা অন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে কেন পণ্য বিক্রি করেনা বরং পণ্যের বিজ্ঞাপণ প্রচারনা করে? কারণ, তারা ডেটাকে কাজে লাগিয়ে স্ট্র্যাটেজি সেট করে, এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রমোশনের জন্যে ব্যবহার করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

শুধু ইকমার্স নয়, যেকোন ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য পেতে হলে বর্তমানে ডেটা সংরক্ষন করতে হয়। অর্থাৎ, আপনার কাস্টমার কিংবা অডিয়েন্সকে ফানেলিং করে করে তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা, যাতে করে তারা পুনরায় এবং বারবার আপনার কাছে ফিরে আসে পণ্য কিনতে। এই ফানেলিং করতে হলে আপনার বিভিন্ন ওয়েব ট্র্যাকার নিজের ওয়েবসাইটে বসাতে হয়, যার মাধ্যমে ওয়েবসাইটে ভিজিটরদের ডেটা আপনি সংরক্ষন করতে পারবেন এবং মার্কেটিং চালানোর জন্য ব্যবহার করতে পারবেন।

তাছাড়া আপনার পেইজে কাস্টমার এসে কতক্ষন থাকছে, কোন প্রোডাক্ট দেখছে, পেইজের কোন কোন জায়গায় নেভিগেট করছে এই ডেটা আপনি ফেসবুক পেইজে পাবেন না। অথচ ওয়েবসাইটে এধরনের ডেটা ট্র্যাক করা যায় যেগুলো আপনাকে বিভিন্ন বিজনেস ডিসিশন নিতে সাহায্য করবে।

যেমন, ফেসবুক পিক্সেল যদি আপনি ওয়েবসাইটে যুক্ত করেন, তাহলে আপনার ওয়েবসাইটে যত মানুষ আসবে, তাদের ডেটা আপনি সংরক্ষণ করে পুনরায় সে মানুষগুলোকে ফেসবুকেই আবারো টার্গেটেড এডস দেখাতে পারবেন, এতে করে আপনার ব্র্যান্ড সম্পর্কে একজন কাস্টমারের টপ অফ মাইন্ডে আপনি স্থান করে নিতে পারেন এবং সেলস পেতে পারেন।

আর এই কাজগুলো শুধুমাত্র ফেসবুক ভিত্তিক ব্যবসা করে পুরোপুরি সম্ভব নয়।

৬) ফেসবুকে অর্গানিক কাস্টমার-বেইজ তৈরী সম্ভব নয়

আপনি যদি একটি ব্র্যান্ড তৈরী করতে চান, আপনার ব্যবসার অর্গানিক কাস্টমার-বেইজ ও বিল্ড করতে হবে। আর এটি করতে হলে এসইও বা সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা সাধারনত কোনো কিছু প্রয়োজন হলে গুগলে গিয়ে সার্চ করি, এবং গুগল আমাদের রিলিভেন্ট ইনফরমেশন এবং লিঙ্কগুলো দেখায়। এটা মূলত হয় এসইও এর মাধমেই। এর মাধ্যমে অর্গানিক ভিজিটর আপনার ওয়েবসাইটে আসার সম্ভাবনা আছে, যেটি আপনার মার্কেটিং বাজেট অপ্টিমাইজ করতে সহায়তা করবে, সেইসাথে আপনার অর্গানিক কাস্টমার-বেইজও তৈরী করবে।

কিন্তু একই কাজ কেউ ফেসবুকে এসে করবেনা, ফেসবুকে সাধারনত মানুষ কিছু কিনতে আসার উদ্দেশ্যে সার্চ করেনা। আর ফেসবুকে অর্গানিক রিচও অনেক কম, প্রায় ২% এরও নিচে

পরিশেষে বলা যায়, ফেসবুক ভিত্তিক হয়ে বসে থাকলে ব্যবসার গ্রো করার সম্ভাবনা কম, কারণ, এটি আপনাকে লং টার্মে টিকিয়ে রাখবেনা। এই অবস্থায় অনেকে চিন্তায় পড়েন, ইকমার্স করতে গেলে তো অনেক খরচ আছে, তাছাড়া টেকনিক্যাল অনেক ব্যাপারে জানতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও ব্যাপারটি সত্য নয় এখন। এখন এমন অনেক প্ল্যাটফর্ম আছে, টুলস আছে যেগুলো দিয়ে স্মার্টফোন থেকেই নিজের ইকমার্স ওয়েবসাইট তৈরী করে নেয়া যায়, মাত্র কয়েক মিনিটেই। কোনো কোডিং জানার কিংবা টেকনিক্যাল বিষয়ে বিশদ ধারনা থাকার দরকার নেই।

আশা করি এই পোস্টটি আপনাদের কিছুটা হলেও ধারনা দিতে পেরেছে কখন এবং কেন এফ-কমার্স ব্যবসাকে ইকমার্স ব্যবসায় রুপান্তর করার উপযুক্ত সময়। শুভকামনা!

Get started now.

Join the league of 2500+ businesses who are relentlessly growing their business with Bonik

Get Started
Remote work